নিষিদ্ধ জালের দৌরাত্ম্যে ঠাকুরগাঁওয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ
Rangpur24
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 1, 2026 | সংবাদটি দেখেছেন : 70
**নিজস্ব প্রতিবেদক, ঠাকুরগাঁও**
একসময় ঠাকুরগাঁওয়ের নদী, খাল-বিল, জলাশয় ও ধানক্ষেতজুড়ে দেখা মিলত নানা প্রজাতির দেশি মাছের। বর্ষার মৌসুমে জেলেদের জালে ধরা পড়ত শিং, মাগুর, টেংরা, পুঁটি, কৈ, খলিশা, চিংড়ি, কাচকি, টাকি, বোয়াল, শোল ও গজারসহ অসংখ্য দেশি মাছ। গ্রামের বাজারগুলো ছিল এসব মাছের সমারোহে ভরপুর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন আগের মতো দেশি মাছ পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞ, জেলে ও স্থানীয়দের মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও মশারি জালের অবাধ ব্যবহার।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, নদী-নালা ও খাল-বিলে রাতের আঁধারে কিংবা দিনের বেলাতেও প্রকাশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ জাল। এসব জালের সূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা ও ডিমওয়ালা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশি মাছের সংখ্যা।
সদর উপজেলার জেলে আব্দুল হালিম বলেন, “দশ বছর আগেও একবার জাল ফেললে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন তার এক-তৃতীয়াংশও পাওয়া যায় না। ছোট ছোট পোনা মাছ পর্যন্ত ধরে ফেলায় মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।”
রাণীশংকৈল উপজেলার কৃষক ও মাছ শিকারি মোজাম্মেল হক জানান, আগে বর্ষাকালে বাড়ির পাশের খাল থেকেই পরিবারের চাহিদা মেটানোর মতো মাছ পাওয়া যেত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও তেমন মাছ মেলে না। তিনি বলেন, “মশারি জাল দিয়ে সব ধরনের ছোট মাছ ধরে ফেলা হচ্ছে। এতে জলাশয়ে মাছ টিকতে পারছে না।”
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কারেন্ট জাল, মশারি জালসহ কয়েক ধরনের জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ এসব জাল পানিতে থাকা প্রায় সব ধরনের মাছ ও পোনাকে আটকে ফেলে। একটি জলাশয়ে কয়েকদিন এমন জাল ব্যবহার করা হলে সেখানে মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশি মাছ শুধু খাদ্য নয়, এটি একটি অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশি মাছ কমে গেলে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে হারিয়ে যায় স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার টাঙ্গন নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা নূর ইসলাম বলেন, “আগে নদীতে বোয়াল, আইড়, পাবদা ও টেংরা মাছ পাওয়া যেত। এখন এসব মাছ দেখাই যায় না। বাজারে যা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই চাষের মাছ।”
জেলেরা জানান, দ্রুত লাভের আশায় অনেকেই নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করছেন। এক রাতেই বিপুল পরিমাণ ছোট মাছ ধরা যায় বলে তারা এসব জালের প্রতি ঝুঁকছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ। এতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রকৃত জেলেরাই।
স্থানীয় বাজারগুলোতেও দেশি মাছের সংকট স্পষ্ট। ঠাকুরগাঁও শহরের মাছ ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক জানান, কয়েক বছর আগেও স্থানীয় জলাশয়ের দেশি মাছের চাহিদা মেটানো যেত। এখন অধিকাংশ সময় বাইরের জেলা থেকে মাছ আনতে হয়। তিনি বলেন, “দেশি মাছের দাম বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ কমে গেছে। ক্রেতারা খুঁজলেও অনেক মাছ পাওয়া যায় না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিষিদ্ধ জালের পাশাপাশি জলাশয় ভরাট, কীটনাশকের ব্যবহার, নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও দেশি মাছ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে সবচেয়ে দ্রুত ও দৃশ্যমান ক্ষতি করছে অবৈধ জালের ব্যবহার।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাঝে মধ্যেই নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পর আবারও একইভাবে জাল ব্যবহার শুরু হয়। ফলে টেকসই ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। জেলেদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি, নিয়মিত প্রচারণা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে অবৈধ জালের ব্যবহার কমানো সম্ভব।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছের প্রজনন মৌসুমে জলাশয় রক্ষা, অভয়াশ্রম বৃদ্ধি এবং নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে দেশি মাছের সংখ্যা আবারও বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ বাসিন্দাদের অনেকেই এখনও স্মরণ করেন সেই সময়ের কথা, যখন গ্রামের শিশু-কিশোররা বর্ষার পানিতে হাত জাল বা ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে নামত। খাল-বিল ছিল মাছে ভরপুর। কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্য অনেকটাই স্মৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে।
দেশি মাছের অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় বা ছবিতে এসব মাছের পরিচয় খুঁজবে। তাই জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি ও সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। ঠাকুরগাঁওয়ের নদী-খাল-বিলকে আবারও দেশি মাছের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে হলে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত লিখুন :