• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
ad728

ভাওয়াইয়ার দীর্ঘশ্বাস, নদী-চরের হাওয়া আর মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা এক লোকবাদ্যের গল্প


FavIcon
Rangpur24
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 1, 2026 | সংবাদটি দেখেছেন : 27
ছবির ক্যাপশন : ad728

উত্তরবঙ্গের কোনো গ্রামে সন্ধ্যা নেমেছে। দূরে গরুর গাড়ির ঘণ্টা, উঠোনে ধানের গন্ধ, আর তার ফাঁকে ভেসে আসছে টানা এক সুর—কখনও মিহি, কখনও করুণ, কখনও যেন মাটির বুক চিরে উঠে আসা হাসি। সেই সুরের শরীরে কণ্ঠের পাশাপাশি যে বাদ্যযন্ত্রটি নিঃশব্দে প্রাণ সঞ্চার করে, তার নাম দোতারা। ছোট্ট কাঠের শরীর, কয়েকটি তার, হাতে ধরা এক টুকরো কটি—এই সামান্য আয়োজনেই উত্তরবঙ্গের লোকজীবন বহুদিন ধরে তার সুখ-দুঃখের ভাষা খুঁজে নিয়েছে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দোতারা বঙ্গীয় লোকবাদ্যযন্ত্র; উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গানে এর ব্যবহার প্রধান। দোতারার ‘কর্ডং-কর্ডং’ ধ্বনির সঙ্গে ভাওয়াইয়ার দীর্ঘ টানা কণ্ঠস্বরের এমন নিবিড় সম্পর্ক যে ভাওয়াইয়াকে অনেক সময় ‘দোতারার গান’ও বলা হয় । এই সম্পর্ক নিছক বাদ্যযন্ত্র ও গানের সম্পর্ক নয়; এটি উত্তরবঙ্গের ভূগোল, মানুষের চলন এবং আবেগেরও সম্পর্ক। বিস্তীর্ণ চর, দূরের হাট, নদীর ঘাট, গৃহস্থের উঠোন—এই জীবনযাপনের ধীর ছন্দে দোতারার সুর যেন স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নিয়েছে।

নামের মধ্যে যত সরলতা, গঠনে তত বৈচিত্র্য

‘দোতারা’ নাম শুনলে মনে হয়, যন্ত্রটির তার বুঝি কেবল দুটি। কিন্তু বাস্তবে তারের সংখ্যা সব সময় দুইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; চার থেকে ছয়টি তারের দোতারাও দেখা যায় । অঞ্চল ও শিল্পীর রীতি অনুযায়ী তারের উপাদানেও পার্থক্য থাকে। কোথাও পিতলের তার, কোথাও পাকানো রেশমের সুতা—লোকশিল্পের এই যন্ত্র তাই একক কোনো নকশায় আটকে নেই।

দোতারার শরীর সাধারণত কাঠের। বাংলাপিডিয়ায় এর কাঠামোকে মাঝারি আকারের ডইয়ের মতো বলা হয়েছে; সেই ফ্রেমে চামড়া ও তার বাঁধা থাকে । যন্ত্রটির মাথায় কাঠ কেটে পাখি বা ময়ূরের নকশা করা হয়—যেন সুরের আগে চোখকেও একটি গল্প শোনানো। তার বাঁধার জন্য থাকে কান বা পেগ, যা ঘুরিয়ে সুরের টান নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রংপুর অঞ্চলে দোতারার কটি—যে অংশটি ঘর্ষণ করে বাজানো হয়—‘চুটকি’ বা ‘খুটনি’ নামেও পরিচিত । বসে বাজালে পায়ের ওপর রাখা যায়, দাঁড়িয়ে বাজালে গলায় ঝুলিয়ে নেওয়া যায়। বাম হাতে যন্ত্রটি আড়াআড়ি ধরে ডান হাতে কটির ঘর্ষণে তারে প্রাণ দেওয়া হয় । এই বাজানোর ভঙ্গিতেও আছে লোকজ সরলতা—কোনো বৃহৎ মঞ্চের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানুষের শরীরের সঙ্গে যন্ত্রটির সরাসরি সংলাপ।

ভাওয়াইয়ার অন্তঃস্বর

ভাওয়াইয়ার গানে বিচ্ছেদ, প্রতীক্ষা, যাত্রা, সংসার ও প্রেমের কথা থাকে। কখনও গরুর গাড়ির গাড়িয়াল দূরপথে, কখনও নদীর ওপারে থাকা প্রিয়জন, কখনও শ্বশুরবাড়ির অচেনা উঠোনে চলে যাওয়া মেয়ের মন—এই সব অভিজ্ঞতা ভাওয়াইয়ার সুরে দীর্ঘশ্বাসের মতো প্রসারিত হয়। দোতারা সেই দীর্ঘশ্বাসকে ধরে রাখে, আবার তার মধ্যে ছন্দও জাগায়। কণ্ঠ যখন দূরে তাকিয়ে থাকে, দোতারা তখন মাটির কাছে ফিরে আসে।

এই কারণেই দোতারা ভাওয়াইয়ার কেবল সঙ্গতকারী নয়। অনেক শিল্পীর হাতে এটি গানের দ্বিতীয় কণ্ঠ হয়ে ওঠে। গায়ক যেখানে শব্দে অনুভূতি প্রকাশ করেন, দোতারা সেখানে বিরতি, টান ও অনুচ্চারিত ব্যথার ভাষা তৈরি করে। তারের ঝংকারে কখনও পথের ধুলো, কখনও বর্ষার নদী, কখনও একা মানুষের ঘরে ফেরার আকুলতা শোনা যায়।

উত্তরবঙ্গের লোকসংগীতের পরিসর অবশ্য ভাওয়াইয়াতেই শেষ নয়। মুর্শিদি, মারফতি, জারি ও কবিগানেও অন্যান্য যন্ত্রের সঙ্গে দোতারা ব্যবহৃত হয় । মধ্যযুগের ‘পদ্মপুরাণ’ ও ‘ধ্যানমালা’ গ্রন্থে দোতারার উল্লেখের কথা বাংলাপিডিয়া জানিয়েছে; ‘স্বরাজ’ ও ‘সুরসংগ্রহ’ নামেও যন্ত্রটির পরিচিতি ছিল । অর্থাৎ দোতারার ইতিহাস কেবল সাম্প্রতিক লোকমঞ্চের ইতিহাস নয়; বাংলা অঞ্চলের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে।

শিল্পীর হাতে যন্ত্রের আত্মপ্রকাশ

উত্তরবঙ্গের দোতারা-চর্চার কথা উঠলে টগর অধিকারীর নাম স্মরণীয় হয়ে আসে। স্থানীয় একটি নিবন্ধে তাঁকে ‘দোতারা সম্রাট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাঁর দোতারা শুধু গানের সঙ্গত করত না, যেন কথা বলত । কাঁঠাল কাঠের তৈরি তাঁর দোতারার সুরে কখনও উলুধ্বনি, কখনও শ্বশুরবাড়ি-যাত্রা করা মেয়ের জন্য মায়ের কান্নার আবহ ফুটে উঠত বলে সেই নিবন্ধে বর্ণনা রয়েছে ।

এ ধরনের বর্ণনা প্রমাণ করে, দোতারার শক্তি কেবল তার কাঠামোতে নয়, শিল্পীর স্পর্শে। একই যন্ত্র একজনের হাতে তাল রাখে, আরেকজনের হাতে চরিত্র পায়। টগর অধিকারীর ক্ষেত্রে দোতারা ও কণ্ঠ—দুইয়ের সমান দক্ষতার কথাও স্থানীয় সূত্রে বলা হয়েছে; এমনকি দোতারায় স্টিলের তার ব্যবহারের কৃতিত্বও তাঁকে দেওয়া হয় । তাঁর জীবনের শেষদিকে দারিদ্র্যের যে ছবি উঠে আসে, তা লোকশিল্পীদের সামাজিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। যে শিল্পী মানুষের স্মৃতিতে সুর রেখে যান, তাঁর নিজের জীবন কেন অনিশ্চয়তায় কাটবে—এই প্রশ্ন দোতারার সুরের মতোই দীর্ঘস্থায়ী।

বেঁচে থাকার দায়

আজ দোতারা লোকউৎসব, মঞ্চ, গবেষণা ও নতুন সংগীতের নানা পরিসরে ফিরে আসছে। কিন্তু মঞ্চে উপস্থিতি আর জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে টিকে থাকা এক জিনিস নয়। যন্ত্র বানানোর কারিগর, সুর শেখানোর গুরু, গ্রামীণ শিল্পী এবং শ্রোতা—এই চারটি স্তর একসঙ্গে সক্রিয় না থাকলে দোতারা কেবল প্রদর্শনীর বস্তু হয়ে যেতে পারে।

তাই দোতারাকে বাঁচানোর কাজ শুধু পুরোনো গান গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দরকার স্থানীয় কারিগরদের কাজের স্বীকৃতি, নতুন প্রজন্মের হাতে হাতে শেখার সুযোগ, স্কুল-কলেজে উত্তরবঙ্গের লোকবাদ্য নিয়ে পাঠ, এবং শিল্পীদের ন্যায্য সম্মানী। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরীক্ষানিরীক্ষা হোক, নতুন গানেও দোতারার ব্যবহার হোক—তবে তার মাটির গন্ধ যেন হারিয়ে না যায়।


...