রিপোর্টার: আয়েশা সিদ্দিকী লিপি,রংপুর।।
উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র রংপুর একসময় ছিল কৃষিনির্ভর, শান্ত ও অপেক্ষাকৃত অনুন্নত একটি জনপদ। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ এই অঞ্চল আজ কালের বিবর্তনে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করছে। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, যোগাযোগ ও নগর উন্নয়নের ধারাবাহিক অগ্রগতির ফলে রংপুর এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় নগরীতে পরিণত হয়েছে। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি রয়ে গেছে নানা চ্যালেঞ্জও।
রংপুরের ইতিহাস বহু প্রাচীন। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, নীল চাষ ও বাণিজ্যের কারণে একসময় এ অঞ্চলের নাম ছিল ‘রঙ্গপুর’, যা পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে রংপুরে রূপ নেয়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ধান, পাট, আলু, ভুট্টা ও বিভিন্ন শস্য উৎপাদনের জন্য রংপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
২০১০ সালে বিভাগ এবং ২০১২ সালে রংপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর নগরায়ণের গতি আরও বৃদ্ধি পায়। প্রায় ২০৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সিটি করপোরেশন বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় নগর প্রশাসনিক কাঠামোর একটি। ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই নগরীতে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস।
এক সময়ের মফস্বল শহর এখন ব্যস্ত নগরজীবনের প্রতিচ্ছবি। শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রশস্ত হয়েছে, বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা, গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, আধুনিক বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি হাসপাতাল। নগরের চেহারায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও রংপুরের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর মেডিকেল কলেজ, কারমাইকেল কলেজসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ঢাকামুখী হতে হলেও এখন রংপুরেই অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার রংপুরের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে। আলু উৎপাদনে রংপুর দেশের শীর্ষস্থানীয় অঞ্চলগুলোর একটি। আধুনিক হিমাগার, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার এবং উন্নত বীজ ও সেচব্যবস্থার ফলে কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ভুট্টা, সবজি ও ফল উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন রংপুরের পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। মহাসড়ক উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ এবং আন্তঃজেলা যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হয়েছে। রংপুর থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহন এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত ও সহজ। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দৃশ্যমান। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা বেড়েছে। আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের ফলে অনেক রোগীকে আর চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী শহরে যেতে হয় না। যদিও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
নগর উন্নয়নের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। সরকারি বিভিন্ন সেবা এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রদান করা হচ্ছে। শিক্ষা, ব্যাংকিং, ব্যবসা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার রংপুরকে আধুনিক নগরীর দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
সম্প্রতি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম শুরু হওয়াকে নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে।
তবে উন্নয়নের এ ধারার মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নগরের অনেক এলাকায় এখনো কাঁচা রাস্তা রয়েছে। ড্রেনেজ সংকট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ নাগরিকদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অর্থসংকটের বিষয়ও সামনে এসেছে।
শ্যামাসুন্দরী খাল, যা একসময় রংপুর শহরের পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল, বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পরিবেশবিদরা মনে করছেন, নগরীর টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রংপুরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের বিষয়েও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। দ্রুত বর্ধনশীল এই নগরীকে বাসযোগ্য রাখতে নাগরিক সচেতনতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রংপুরের প্রবীণ বাসিন্দারা বলেন, কয়েক দশক আগের রংপুর আর বর্তমান রংপুরের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। একসময় যেখানে সীমিত সুযোগ-সুবিধা ছিল, সেখানে এখন আধুনিক নগর জীবনের অনেক উপকরণ পৌঁছে গেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে রংপুর এখন শুধু একটি জেলা বা বিভাগীয় শহর নয়, বরং সম্ভাবনাময় একটি আধুনিক নগর কেন্দ্র।
কালের বিবর্তনে বদলে যাওয়া রংপুর আজ উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও নগরায়ণের অগ্রযাত্রা রংপুরকে দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে রংপুর আরও আধুনিক, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত লিখুন :