তিস্তা: জলসংকটে রংপুরের জীবন
Rangpur24
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 1, 2026 | সংবাদটি দেখেছেন : 45
মাহফুজ আলম প্রিন্স,রংপুর।।
একই নদী কখনও আশীর্বাদ, কখনও আতঙ্ক—তিস্তাপাড়ের মানুষ আর কতদিন এই দ্বৈত বাস্তবতার সঙ্গে বাঁচবে?
রংপুরের তিস্তাপাড়ে নদীকে শুধু মানচিত্রের একটি নীল রেখা দিয়ে বোঝা যায় না। নদী এখানে ঘরের উঠোন, ফসলের মাঠ, মাছ ধরার জাল, নৌকার বৈঠা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সবকিছুর নাম। যে তিস্তা একসময় মানুষের ঘরে ধান, পুকুরে মাছ আর গোয়ালে গরুর নিশ্চয়তা এনে দিত, সেই নদীই এখন শুষ্ক মৌসুমে বালুচর আর বর্ষায় ভাঙন-ভয়ের প্রতীক। তিস্তাকে ঘিরে রংপুরের মানুষের জীবন তাই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে আটকে আছে: পানি যখন দরকার, তখন নদী শুকনো; আর যখন পানি আসে, তখন তা অনেক সময় বন্যা হয়ে আসে।
নদী আছে, পানি নেই
তিস্তা ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন নদী। শুষ্ক মৌসুমে পানি ভাগাভাগি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহকে অনিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশে তিস্তার অংশ রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ জনপদের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নদীর পানি কমে গেলে তার প্রভাব শুধু নদীর তলদেশে পড়ে না; তা ছড়িয়ে পড়ে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ, বাজার ও মানুষের পারিবারিক জীবনে। তিস্তা নিয়ে পানি-বণ্টন চুক্তি এখনও বাস্তবায়িত না হওয়ায় নদী-নির্ভর মানুষের উদ্বেগও কাটেনি ।
ঢাকা পোস্টের এক প্রতিবেদনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিস্তা প্রতিবছর দুই কোটি টনের বেশি পলি বহন করে। এতে নদীর ধারণক্ষমতা কমছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ যেখানে ৫ হাজার কিউসেক থাকার কথা, সেখানে তা প্রায় ৪০০ কিউসেকে নেমে এসেছে; এর ফলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে । এই পরিসংখ্যান কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব নয়—এর ভেতরে আছে কৃষকের বাড়তি সেচব্যয়, ফসল নষ্ট হওয়ার ভয়, ঋণের বোঝা এবং সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তা।
চরের কৃষক তখন নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন, কিন্তু নদী যেন তাঁর দিকে তাকায় না। ভুট্টা, মরিচ, কুমড়া, বাদাম, গম, তিসি, সূর্যমুখী ও পাট—চরাঞ্চলের কৃষিতে নানা ফসলের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু পানি না থাকলে সেই সম্ভাবনা গভীর নলকূপ, ডিজেল, বিদ্যুৎ এবং বাড়তি শ্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে । ছোট কৃষকের কাছে সেচের প্রতিটি খরচ লাভের হিসাবকে আরও সংকুচিত করে। নদী যখন বিনা খরচে সেচের সহায়তা দিতে পারে না, তখন কৃষি আর শুধু মাটির সঙ্গে লড়াই থাকে না; তা হয়ে ওঠে পুঁজির সঙ্গেও লড়াই।
বর্ষার পানি, ভাঙনের আতঙ্ক
শুষ্ক মৌসুমের মরা নদীর চেহারা বর্ষায় বদলে যায়। উজানে ভারী বৃষ্টি ও পানির প্রবাহ বাড়লে তিস্তা দ্রুত ফুলে ওঠে। নদীর বুক পলি জমে অগভীর হয়ে গেলে অতিরিক্ত পানি ধারণের ক্ষমতাও কমে যায়। তখন বন্যা শুধু ঘরবাড়ি ডোবায় না; ভেঙে দেয় সড়ক, বাঁধ, বিদ্যালয়, বাজার ও মানুষের বহু বছরের সঞ্চয়। নদীভাঙনে একবার ঘর হারানো মানুষকে আবার নতুন চরে ঘর তুলতে হয়—কিন্তু সেই চরও যে স্থায়ী, তার নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিস্তা-সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের সমন্বয়কারী বলেছেন, নদীভাঙনে আবাদি জমি ও জনবসতি বিলীন হচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য; তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জলসংকট ও জীবিকার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে । এই অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি আঘাত করে দরিদ্র পরিবারকে। জমি হারালে কৃষক শ্রমিক হন, নৌকা হারালে মাঝি দিনমজুর হন, মাছ কমলে জেলের ঋণ বাড়ে। নদীভাঙনের ক্ষত তাই কেবল ভৌগোলিক নয়—এটি সামাজিক পরিচয় ও মর্যাদারও ক্ষয়।
হারিয়ে যাচ্ছে নদী-নির্ভর জীবন
তিস্তার পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর মাছের আবাসস্থলও সংকুচিত হচ্ছে। নদী শুকিয়ে গেলে জেলে ও মাঝিদের কাজ কমে যায়, নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়, চরবাসীকে ফসল ও মানুষ পারাপারে বিকল্প পথ খুঁজতে হয়। ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে স্থানীয় জেলে ও কৃষকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না, নদী পারাপারে নৌকার বদলে কখনও মানুষ হেঁটে যায়, আবার সেচের জন্য গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বাড়ে ।
এই পরিবর্তনের সামাজিক মূল্যও কম নয়। নদীর সঙ্গে যুক্ত পেশাগুলো হারালে তরুণেরা কাজের খোঁজে শহর বা দেশের বাইরে পাড়ি জমায়। পরিবারে থেকে যান নারী, শিশু ও প্রবীণরা; তাঁদের ওপর পড়ে ঘর, জমি ও জীবিকার বাড়তি চাপ। ভাঙনের পর নতুন জায়গায় বসতি গড়লে স্কুল, চিকিৎসা, বাজার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তিস্তাপাড়ের জলসংকট তাই শুধু কৃষি বা নদী ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি অভিবাসন, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যেরও বিষয়।
সমাধান কি শুধু বাঁধে?
তিস্তা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র কথা আসে। বাংলাদেশ অংশে প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় নদী খনন, পলি ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, নৌ-যোগাযোগ, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও নদীতীর রক্ষার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে । পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি রংপুরে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়; নদীপাড়ের মানুষের কাছে এটি টিকে থাকার প্রশ্ন।
তবে যে কোনো বড় প্রকল্পের আগে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, পরিবেশগত সমীক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। নদীকে কেবল সোজা করে বেঁধে ফেললেই সমাধান হবে না। তিস্তার চর, শাখানদী, জলাভূমি, মাছের প্রজননক্ষেত্র ও স্বাভাবিক প্রবাহকে বিবেচনায় নিতে হবে। নদী খননের পলি কোথায় যাবে, ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা কার জমি রক্ষা করবে, বাস্তুচ্যুত মানুষ কোথায় যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
একই সঙ্গে দরকার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ন্যায্য পানি-বণ্টন ও অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। উজান-ভাটির নদীকে রাজনৈতিক সীমানায় ভাগ করা যায়, কিন্তু তার প্রবাহকে আলাদা করা যায় না। শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য পানি না এলে বাংলাদেশে কৃষি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে; বর্ষায় হঠাৎ অতিরিক্ত পানি এলে বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে। তাই তিস্তার সমাধান হতে হবে নদী, প্রকৃতি ও মানুষের সম্মিলিত স্বার্থের ভিত্তিতে।
নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে
তিস্তাকে ঘিরে রংপুরের মানুষের দাবি খুব জটিল নয়: নদীতে সারা বছর যুক্তিসংগত পানি-প্রবাহ, ভাঙন থেকে বসতি ও কৃষিজমির সুরক্ষা, বন্যার আগাম সতর্কতা, সেচে ন্যায্যতা, জেলে-মাঝির বিকল্প জীবিকা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন। এর সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদার করা। নদীর তীরের মানুষ নদীকে সবচেয়ে কাছ থেকে চেনে; তাঁদের অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো পরিকল্পনা পূর্ণতা পাবে না।
তিস্তা আজ রংপুরের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নদী শুকিয়ে গেলে কৃষি, মাছ, নৌপথ ও কর্মসংস্থান একসঙ্গে দুর্বল হয়; নদী হঠাৎ ফুলে উঠলে ঘরবাড়ি, জমি ও অবকাঠামো বিপন্ন হয়। এই দ্বৈত সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জল-সামাজিক সংকট, যার সমাধানে কূটনীতি, বিজ্ঞান, পরিবেশনীতি এবং মানুষের অধিকার—সবকিছুকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিস্তা শুধু রংপুরের নদী নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা। নদীর স্রোত ফিরিয়ে আনা মানে কেবল পানির প্রবাহ বাড়ানো নয়—ফিরিয়ে আনা কৃষকের আস্থা, জেলের জীবিকা, চরের শিশুর ভবিষ্যৎ এবং নদীপাড়ের মানুষের ঘরে ফেরার অধিকার। তিস্তাকে বাঁচানোর কাজ তাই প্রকল্পের অপেক্ষায় থেমে থাকতে পারে না; এটি এখনই শুরু হওয়া মানুষের বেঁচে থাকার কাজ।
আপনার মতামত লিখুন :