মাহফুজ আলম প্রিন্স | রংপুর
রংপুরের যানজটের পেছনে কি কোনো অদৃশ্য স্বার্থ?
রংপুর নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালকে একসময় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আধুনিক টার্মিনাল হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রশস্ত জায়গা, শত শত বাস রাখার সুবিধা, যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাকক্ষ, টিকিট কাউন্টার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো মিলিয়ে এটি ছিল নগরীর পরিবহন ব্যবস্থাকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনার বড় উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
আজও নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়ক এবং বাণিজ্যিক এলাকায় গড়ে উঠেছে আলাদা আলাদা বাসস্ট্যান্ড। ঢাকা, বগুড়া, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট কিংবা বিভিন্ন আঞ্চলিক রুটের বাসগুলো নগরীর বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ওঠানামা করছে। ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে যানজট, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে প্রতিদিন।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থাকতেও কেন ঢাকা বাস ষ্ট্যান্ড কামার পাড়ায় বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরিচালিত হচ্ছে অন্যান্য বাসস্ট্যান্ডগুলো? কেন সব রুটকে এক জায়গায় এনে একটি সমন্বিত টার্মিনাল ব্যবস্থার আওতায় আনা যাচ্ছে না?
নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড়, সিটি বাজার এলাকা, পায়রা চত্বর, আধুনিক মোড়, ধাপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রায়ই দেখা যায় বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করছে। অনেক ক্ষেত্রে অটো গুলো সড়কের একাংশ দখল করে রাখে। এতে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক মিনিটের কাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিচ্ছে শুধু যানজটের কারণে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং জরুরি রোগীবাহী যানবাহনও এই ভোগান্তি থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে না। অনেক বাস মালিক ও পরিবহন কোম্পানি নগরীর ভেতরেই তাদের নিজস্ব কাউন্টার ও যাত্রী সংগ্রহ কেন্দ্র পরিচালনা করতে বেশি আগ্রহী।
কারণ হিসেবে তারা যাত্রীসুবিধার কথা বললেও নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, এর পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থও থাকতে পারে। শহরের ভেতরে কাউন্টার থাকলে যাত্রী সংগ্রহ সহজ হয়, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সুবিধাও বজায় থাকে।
পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তির মতে, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ জড়িয়ে গেছে। বাস মালিক, কাউন্টার ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা মিলেই একটি অঘোষিত কাঠামো তৈরি হয়েছে।
ফলে কেন্দ্রীয় টার্মিনালে সব রুটকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ নয়। একক কোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক শহরেই আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার পরিবহন নির্দিষ্ট টার্মিনালকেন্দ্রিক। এতে শহরের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় যানবাহনের চাপ কমে, যাত্রীসেবা উন্নত হয় এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়।
রংপুরেও একই মডেল কার্যকর করা সম্ভব। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালকে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করে সব রুটের বাসকে সেখানে নিয়ে আসা গেলে নগরীর প্রধান সড়কগুলো অনেকটাই যানজটমুক্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
রংপুরবাসীর প্রশ্ন খুবই সহজ। যখন একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল রয়েছে, তখন নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলো কেন বাসস্ট্যান্ডে পরিণত হবে? কেন প্রতিদিন যানজটে আটকে থাকতে হবে সাধারণ মানুষকে?
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু অবকাঠামোগত নয়, প্রশাসনিক ও নীতিগতও। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে রংপুরের যানজট সমস্যার একটি বড় অংশ সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন দেখার বিষয়, নগরবাসীর দীর্ঘদিনের এই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, নাকি কেন্দ্রীয় টার্মিনাল থাকার পরও নগরীর সড়কগুলোই অনানুষ্ঠানিক বাসস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকবে।