Logo
প্রিন্টের তারিখ ও সময়: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৫ পূর্বাহ্ন | প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬

আর কত দিন শীতের অপেক্ষা? মৌসুমের আগমনী বার্তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল

আর কত দিন শীতের অপেক্ষা? মৌসুমের আগমনী বার্তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল
মাহফুজ আলম প্রিন্স,রংপুর।।
বাংলাদেশে বর্ষা ও শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের আগমন মানেই শীতের অপেক্ষা শুরু। বছরের এই সময়টায় অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, আর কত দিন পর শুরু হবে শীত? বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে যখন দিনের তাপমাত্রা এখনও বেশ বেশি থাকে, তখন শীতের অনুভূতি যেন অনেক দূরের বিষয় মনে হয়। তবে আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয় এবং সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শীতের আগমনী বার্তা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শীতের প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করে। তবে উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে রংপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর অঞ্চলে শীত একটু আগেই নামতে শুরু করে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকেই রাতের তাপমাত্রা কমতে থাকে এবং ভোরবেলায় হালকা কুয়াশা দেখা যায়। ফলে এখন থেকে আরও প্রায় দুই মাস পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় শীতের প্রকৃত আবহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে শীতের প্রস্তুতির সময় বলা যায়। এ সময় সূর্যের অবস্থান ধীরে ধীরে দক্ষিণে সরে যায়। দিনের দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করে এবং রাত দীর্ঘ হয়। ফলে রাতে মাটি ও বাতাস দ্রুত তাপ হারায়। এর প্রভাবেই ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমতে থাকে। প্রথমে রাত ও ভোরে ঠান্ডা অনুভূত হয়, পরে দিনের বেলাতেও শীতের প্রভাব বাড়তে থাকে।

উত্তরাঞ্চলের মানুষ প্রতিবছরই শীতকে অন্যভাবে অনুভব করেন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যখন শীতের উপস্থিতি সীমিত থাকে, তখন রংপুর বিভাগে শুরু হয়ে যায় কনকনে ঠান্ডা। বিশেষ করে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার এলাকায় ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ প্রায় নিয়মিত ঘটনা। কৃষি, শিক্ষা, পরিবহন এবং জনজীবনের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। তাই শীত আসার আগেই অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

শীত শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রারও একটি অংশ। গ্রামাঞ্চলে শীতকাল মানেই নতুন সবজির মৌসুম। মাঠে মাঠে দেখা যায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, গাজর ও বিভিন্ন শাকসবজির চাষ। কৃষকেরা সারা বছর ধরে এই সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। কারণ শীতকালীন ফসল তাদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করে।

অন্যদিকে শহুরে জীবনে শীত মানেই ভিন্ন এক আনন্দ। গরম কাপড় বের করা, পিকনিক আয়োজন, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং শীতকালীন খাবারের আয়োজন মানুষের জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। খেজুরের রস, পিঠাপুলি, ভাপা পিঠা ও নানান ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার শীতের অন্যতম আকর্ষণ। ফলে শীত শুধু একটি ঋতু নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক অনুভূতিও বটে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতের ধরনে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, অনেক বছরেই শীত দেরিতে শুরু হচ্ছে এবং এর স্থায়িত্বও কমে আসছে। কখনও আবার স্বল্প সময়ের জন্য তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে ঋতুচক্রের স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসছে, যা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু সংবেদনশীল দেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

পরিবেশবিদদের মতে, বনভূমি কমে যাওয়া, নগরায়ণ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের কারণে স্থানীয় আবহাওয়ার ওপরও প্রভাব পড়ছে। ফলে আগের তুলনায় অনেক এলাকায় শীতের তীব্রতা কম অনুভূত হচ্ছে। তবে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও খোলা প্রান্তরে এখনও শীতের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি থাকে।

এদিকে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শীত নিয়ে আলাদা আগ্রহ রয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শীতের অপেক্ষার কথা জানাচ্ছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে গরম কাপড় প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন। আবার অনেকে আশা করছেন, এবার শীত কিছুটা আগেভাগেই নামবে। যদিও আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়েই শীতের আগমন ঘটার সম্ভাবনা বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীত মৌসুমের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য শীতবস্ত্র সংগ্রহ, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশু ও বয়স্কদের সুরক্ষার বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা জরুরি। কারণ শীতের সময় শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, শীতের জন্য এখনও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। সেপ্টেম্বরের গরম পুরোপুরি বিদায় নিতে সময় লাগলেও প্রকৃতিতে পরিবর্তনের আভাস ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। রাতের আকাশ, ভোরের বাতাস এবং দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন জানান দিচ্ছে, শীত খুব বেশি দূরে নয়। আর কয়েক সপ্তাহ পরই হেমন্তের আবহে প্রকৃতি নতুন রূপ নেবে, এরপর ধীরে ধীরে নেমে আসবে কাঙ্ক্ষিত শীতের মৌসুম। তখন আবারও কুয়াশা, উষ্ণ পোশাক, পিঠাপুলি আর শীতের নানান স্মৃতিতে মুখর হয়ে উঠবে বাংলাদেশের জনজীবন।