আয়েশা সিদ্দিকী লিপি
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। ঋতুভিত্তিক নানা উৎসব, কৃষিকাজকে ঘিরে মানুষের আনন্দ-বেদনা, গান, নৃত্য ও সামাজিক আচার মিলেই গড়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের বর্ণিল সংস্কৃতি। উত্তরাঞ্চলের জনপদে এমনই এক প্রাচীন লোকজ উৎসবের নাম ‘ভাদর কাটানি’। সময়ের পরিবর্তনে অনেক লোকজ আয়োজন হারিয়ে গেলেও এখনও কিছু কিছু এলাকায় এই উৎসব মানুষের স্মৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে টিকে আছে।
বাংলা বছরের ভাদ্র মাসকে কেন্দ্র করেই ‘ভাদর কাটানি’ উৎসবের উৎপত্তি। কৃষিনির্ভর সমাজে ভাদ্র মাস ছিল এক ধরনের অভাবের সময়। আমন ধান তখনও ঘরে ওঠেনি, আগের ফসলের মজুতও প্রায় শেষ। এই সময়টিকে গ্রামের মানুষ ‘মঙ্গার সময়’ বলেও উল্লেখ করতেন। কঠিন এই সময় পার করে নতুন আশার অপেক্ষায় থাকতেন কৃষক পরিবারগুলো। তাই ভাদ্র মাসের শেষভাগে মানুষ আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে দুঃসময়ের অবসান এবং নতুন দিনের প্রত্যাশাকে উদযাপন করত। সেই উদযাপনই ধীরে ধীরে ‘ভাদর কাটানি’ নামে পরিচিতি পায়।
রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় একসময় ভাদর কাটানি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। গ্রামের তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোর এবং প্রবীণরা দিনভর নানা আয়োজনের মাধ্যমে এই উৎসব পালন করতেন। কোথাও আয়োজন হতো লোকগানের আসর, কোথাও পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া কিংবা জারি-সারি গান। আবার অনেক এলাকায় থাকত গ্রামীণ খেলাধুলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ কিংবা মেলার আয়োজন।
ভাদর কাটানির অন্যতম আকর্ষণ ছিল দলবদ্ধ গান। গ্রামের কিশোর ও তরুণরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গাইত। গানের মাধ্যমে তারা ভাদ্র মাসের কষ্ট, মানুষের সংগ্রাম এবং নতুন ফসলের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরত। গৃহস্থরা তাদের চাল, ডাল, ধান কিংবা সামান্য অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন। পরে সেই সংগ্রহ করা সামগ্রী দিয়ে আয়োজন করা হতো সমবেত ভোজের। এতে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হতো।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, ভাদর কাটানি শুধু একটি উৎসব নয়; এটি ছিল সামাজিক সংহতির প্রতীক। কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী কিংবা দিনমজুর, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করতেন। উৎসবটি মানুষকে শিখিয়েছে ভাগাভাগি করে নেওয়ার সংস্কৃতি এবং সম্মিলিতভাবে কঠিন সময় মোকাবিলার শক্তি।
একসময় ভাদর কাটানির গান ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে। এসব গানে উঠে আসত প্রকৃতি, নদী, কৃষকের জীবনসংগ্রাম, প্রেম-বিরহ এবং সামাজিক বাস্তবতার কথা। ভাওয়াইয়ার সুরে কিংবা লোকগীতির ছন্দে গাওয়া এসব গান গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। অনেক প্রবীণ আজও স্মৃতিচারণ করে বলেন, ভাদর কাটানির রাতগুলো ছিল আনন্দে ভরা। গ্রামের মাঠে কিংবা বড় কোনো উঠানে বসত গানের আসর, চলত গল্প, আড্ডা আর হাসি-আনন্দ।
তবে আধুনিকতার প্রবল স্রোতে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, নগরায়ণ, সামাজিক পরিবর্তন এবং লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই ভাদর কাটানির নাম পর্যন্ত জানে না। যে মাঠে একসময় লোকগানের সুর ভেসে বেড়াত, সেখানে এখন দেখা যায় ব্যস্ততার ভিন্ন চিত্র। ফলে ধীরে ধীরে লোকজ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিস্মৃতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবুও আশার কথা হলো, উত্তরাঞ্চলের কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক এবং সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ ভাদর কাটানির ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন স্থানে লোকজ উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গবেষণামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে লোকসংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকজ উৎসব শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ভাদর কাটানি উত্তরাঞ্চলের মানুষের সংগ্রাম, আশা এবং সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য প্রতীক। তাই এই উৎসবকে সংরক্ষণ করা মানে একটি অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখা।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে। ভাদর কাটানি সেই বৈচিত্র্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও মানুষের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক কখনও পুরোপুরি মুছে যায় না। উত্তরাঞ্চলের মাটি, মানুষ এবং কৃষিভিত্তিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই উৎসব আজও স্মরণ করিয়ে দেয় পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের কথা।
ভাদ্রের শেষ প্রহরে যখন নতুন দিনের অপেক্ষায় মানুষ বুক বাঁধে, তখন ভাদর কাটানির স্মৃতি যেন আবারও ফিরে আসে। লোকগানের সুর, গ্রামীণ মেলার কোলাহল, সমবেত আনন্দ আর মানুষের আন্তরিক মিলনের বার্তা বহন করে এই উৎসব। উত্তরাঞ্চলের জনপদে তাই ‘ভাদর কাটানি’ কেবল একটি লোকজ উৎসব নয়, এটি মানুষের জীবন, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির এক অমলিন অধ্যায়।