April 13, 2021, 2:10 am

স্যামসাং প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড শপ এখন আর,এ,এম,সি শপিং কমপ্লেক্স এর পঞ্চম তলায়। শপ নংঃ- ২,৩,৪ প্রয়োজনেঃ- ০১৩২২৭১৪৮৪৭, ০১৮১৮৭০১৮৭২

শতাধিক অবৈধ ইটভাটা, কাজ করছে শিশুরা, হুমকিতে কৃষি

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, March 21, 2021
  • 90 Time View

ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কৃষি জমিতে গড়ে উঠছে শতাধিক অবৈধ ইটভাটা। এই ইটভাটাগুলোর নেই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র ও লাইসেন্স। তারপরও বছরের পর বছর এভাবেই চলছে এসব অবৈধ ভাটা। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় অনুমোদনহীন এসব ভাটায় ইট তৈরি, টানা ও কাঁচা ইট পোড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ আগুন দেয়ার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাটাগুলোতে এভাবে শিশুদের দিয়ে কাজ করালে হুমকির মুখে পড়বে শিশুদের ভবিষ্যত। পাশাপাশি ভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় অনুর্বর হয়ে পড়ছে কৃষি জমি, নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল ও দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না কৃষকরা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কেএম ব্রিকস্ ভাটায় দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ইট তৈরি, টানা ও ইট পোড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ আগুন দেয়ার কাজ করছে গৌরাঙ্গ রায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাটায় রাবিশ পরিষ্কার করে ভাটার কাঁচা ইটের লাইনে আগুন দেয়ার কাজ করছে সে। গৌরাঙ্গ জানায়, তার বয়স মাত্র ১২ বছর। সমবয়সী আরো বেশ কয়েকজন একই কাজ করে। এই কাজে অনেক ঝুঁকি রয়েছে। অসাবধানতাবশত পা পিছলে আগুনের নিচে পড়ে গেলে নির্ঘাত মৃত্যু! সব জেনেশুনে তবুও সে এই কাজ করছে। কারণ, দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ হয় তার। পরে পারিবারিক অনটনের কারণে লেকাপড়া বন্ধ করে ভাটার কাজে যোগ দেয় সে।

একই ভাটায় ইট পোড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ আগুন দেয়ার কাজ করে মলেন। সে জানায়, গত তিন বছর থেকে ভাটায় কাজ করে সে। এই কাজে একটু ঝুঁকি থাকলেও পারিশ্রমিক বেশি। প্রতিদিন হাজিরা বাবদ চারশত টাকা করে পায় সে। মাস শেষে খাওয়া খরচ বাদ দিয়ে নয় থেকে দশ হাজার টাকা উপার্জন হয় তার। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল -মে মাস পর্যন্ত টানা চার পাঁচ মাস কাজ করে যে টাকা উপার্জন হয় তা পরিবারের কাজে লাগে।

এভাবেই প্রশাসনের নজনদারিতার অভাবে ঠাকুরগাঁওয়ে অধিকাংশ ভাটায় চলছে শিশুশ্রম। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে বেশ কয়েকজন শিশু কাজ ফেলে ভাটা এলাকার বাইরে লুকিয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অনেক চেষ্টার পর কথা হয় সদর উপজেলার এম এ ব্রিকস্ নামে অন্য এক ভাটার শিশু শ্রমিক আকতারুল ইসলামের সাথে। আকতারুল জানায়, ভাটার পাশের গ্রামে তার বাড়ি। স্কুল বন্ধ থাকায় সকালে ভাটায় এসে ইট তৈরির কাজ করে সে। একহাজার ইট তৈরি করতে দুই দিন সময় লাগে তার। এক হাজার ইট তৈরি করলে ভাটা ম্যানেজার বিনিময়ে তাকে ৩০০ টাকা দেয়। তার বয়সের আরো অনেকে ভাটায় নিয়মিত কাজ করে। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ চলে। কেউ মাটি টানা, কেউ ইট টানা আবার কেউ ইট সাজানোর কাজ করে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিশু শ্রমিকদের মজুরি কম হওয়ায় জেলার শতাধিক ভাটার মধ্যে বেশিরভাগ ইট ভাটাতেই শিশুদের ব্যাবহার করা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। বেশিরভাগ শিশুদের বাড়ি ভাটাগুলোর আশে পাশের গ্রামেই। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুরাও সামান্য টাকার জন্য অবিভাবকদের না জানিয়েই কাজ করছে ইট ভাটাগুলোতে। আবার কেউ পারিবারিক দারিদ্রতার কারণে লেখাপড়া বন্ধ করে বেছে নিয়েছে এই পেশা।

অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকার পাশে গড়ে উঠছে ইটভাটা, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। সদর উপজেলা আকচা ইউনিয়নের কৃষক পরেশ চন্দ্র বর্মন অভিযোগ করেন, তাদের উর্বর জমিতে একসময় বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা ফসল আবাদ হলেও বর্তমানে ভাটার কালো ধোঁয়া আর অতিরিক্ত তাপের কারণে অনুর্বর হয়ে পড়ছে জমি ও জ্বলে যাচ্ছে ফসলাদি। বোরো মৌসুমে ক্ষেতে শ্যালোমেশিনে পানি দিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।
জমিতে পানি দেয়ার কিছুক্ষণ পরই পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। গত বছর প্রায় দুই একর জমির ধান ভাটার তাপে ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় জ্বলে যায়। ইটভাটার কারণে ফসল আবাদে করে প্রতিবছর লোকসান গুণতে হচ্ছে । এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।

সদর উপজেলা ফাড়াবাড়ি এলাকার কৃষক মোহাম্মদ জয়নাল বলেন, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ভাটা ব্যাবসা বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছে মুনাফালোভী ভাটা ব্যবসায়ীরা। কৃষি জমির পাশে ভাটা স্থাপনের নিয়ম না থাকলেও সে নিয়মের তোয়াক্কা করছে না কেউই। এবিষয়ে ভাটা মালিকদের বলেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

ঢোলারহাট ইউনিয়নের কৃষক অখিল রায় জানান, আবাদী জমির উর্বর অংশ কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে, এতে জমির উর্বরতা হারাচ্ছে এবং খাদ্যশস্যের উৎপাদনক্ষমতা কমে যাচ্ছে। নতুন নতুন ভাটা স্থাপনের কারণে দিন দিন ফসলি জমির পরিমাণও অনেক কমে যাচ্ছে।

মুন্সিরহাট এলাকার কৃষক শাকিল হোসেন বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে এবার গম আবাদ করেছেন। কিন্তু ভাটার তাপে ও কালো ধোঁয়ায় তার গম নষ্ট হয়ে গেছে, গমের শিসের ভেতরে কোনো দানা নেই। শুধু তাই নয়, ভাটার কারণে আশেপাশের লিচু, আম বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিনিয়ত কৃষকদের লোকসান গুণতে হচ্ছে। এভাবে কৃষকরা ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ভাটা মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেও কোনো কাজে আসে না।

ভাটায় শিশুশ্রমের বিষয়ে ক্যামারার সামনে কথা বলতে রাজি হননি কোনো ভাটা মালিক। তবে জেলা ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মুরাদ হোসেন শিশুশ্রমের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, সমিতির পক্ষ থেকে সরকারি নির্দেশনা মেনে ভাটা চালানোর জন্য সকলকে বলা হয়েছে। কেউ যদি ভাটায় শিশুদের কাজে নিয়োজিত করে থাকে তবে তার দায়ভার সেই মালিককের। ভাটা মালিকদের কাঠ এর পরিবর্তে কয়লা ব্যাবহার করতে বলা হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী ফসলি জমিতে ইটভাটা নির্মাণে আইনগত কোনো সুযোগ নেই। জেলা কৃষি বিভাগ ইটভাটার লাইসেন্স দেয় না। জেলায় যেসব ইটভাটা চলছে সেগুলোর লাইসেন্স জেলা প্রশাসক দিয়ে থাকেন। লোকালয় ও দ্বি-ফসলি জমিতে ইটভাটা যেন না করা হয়, সেজন্য কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিরুৎসাহিত করা হয় বলে জানান ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক সিরাজুল ইসলাম।

ভাটায় শিশুশ্রম ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে স্বীকার করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শিশুশ্রমের বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া এর মধ্যে বেশ কিছু অবৈধ ভাটা উচ্ছেদ করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি ভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। ভাটা মালিক সমিতিকে সরকারি নির্দেশনা মেনে ভাটা পরিচালনা করতে বলা হয়েছে। এরপরও কেউ আইন অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় একশত ছয়টি ইট ভাটা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ ইট ভাটার নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category