1. [email protected] : Rangpur24 :
ভাষার মাসে অঙ্গীকার করি মনে-প্রাণে বাংলা চাই.আব্দুল করিম -
বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ০৮:৪৫ অপরাহ্ন

ভাষার মাসে অঙ্গীকার করি মনে-প্রাণে বাংলা চাই.আব্দুল করিম

  • Update Time : বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৫১ Time View

ফেব্রুয়ারি মাস। ভাষার প্রতি বীর বাঙালির চেতনার মাস। দুঃসাহসী ভাষাসৈনিকদের আত্মত্যাগের মাস। এই করোনাকালে ভাষার মাস এলো। সামনে আসবে ২১ ফেব্রুয়ারি বা আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা দিবস। ২১ যতই সামনে এগিয়ে আসে ততই শিহরণ জেগে ওঠে আমাদের। মায়ের মুখের ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত, শফিক সহ আরও নাম না জানা আমাদেরই মায়ের বীর সাহসী সন্তানরা হাসিমুখে নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ছোটবেলা থেকে আমাদের প্রাণে প্রাণে ছন্দে ছন্দে বেজে উঠত, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।
তখন এত কিছু উপলব্ধি করতে পারতাম না। বুঝতে পারতাম না ভাষার মর্ম আর রক্তে মাখা বেদনাসিক্ত কাহিনি। এ ভাষাকে সকল প্রতিকূলতা ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক বুক তাজা রক্তের রঙে রাঙাতে হয়েছিল। হানাদাররা গুলি করে থামাতে চেয়েছিল বাঙালির এ মুখের ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্দোলন। কিন্তু আমাদের ভাষাসৈনিকরা হানাদারদের এ হীন চেষ্টাকে রুখে দিয়েছিলেন নিজেদের বুক পেতে দিয়ে। নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে। আমরা অবশেষে পেরেছিলাম মায়ের ভাষাকে মুখের ভাষা হিসেবে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করতে। আমাদের এই অর্জন পুরো বিশ্ব মেনে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দিল। এটা এখন আর শুধু আমাদের দিবস নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মানে সকলের দিবস। এমন রাজকীয় মুকুট আর মহান স্বীকৃতি এ পৃথিবীর আর কারও নেই। এই একুশ আমাদের দিয়েছে প্রাণের আকুতি প্রকাশ করার স্বাধীনতা। নিজেদের মায়ের মুখের ভাষা মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়াই করার অঙ্গীকার। এই একুশে আমাদের ভাষাসৈনিকদের ত্যাগের মহিমা বহন করে ছুটে চলেছে নিরন্তর। যে ভাষাতে আজ সুখ-দুঃখ আর জীবনজয়ের মালা গাঁথি। স্বপ্নের রঙিন রেখা আঁকি। সে ভাষাকে আমরা কি এখনো সে মর্যাদা দিতে পেরেছি?
কাজের সময় কাজ, কাজ করার পর দেখলাম একদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিদেশি আমাদের লজ্জা দিচ্ছে কেন আমরা কথা বলার সময় ভিনদেশি শব্দ ব্যবহার করি! আমরা অন্য ভাষার যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সে শব্দগুলো কি আমাদের বাংলা ভাষায় নেই? আদতে এসব জগাখিচুড়ির ভাষা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অভ্যাস বললে ভুল হবে; বদ-অভ্যাস বললে ভালো হয়। অনেকেই আবার নিজেকে একটু স্টাইলিশ হিসেবে জাহির করতেও ভিন্ন ভিন্ন ভাষার শব্দ ব্যবহার করে। আসলে ভিন্ন ভাষার শব্দ ব্যবহার করে নিজের ভাষাকে হেয় করলে কেউ ব্যতিক্রম হয়ে যায় না। বরং তার রুচি নিয়ে প্রশ্ন জাগে! যা হোক ভাষার মাস এলেই কেবল ভাষাপ্রীতি উথলে ওঠে। এখন সামাজিকমাধ্যমেও ভাষা প্রেমের ঝড় উঠেছে।
সব কিছুকে ছাপিয়ে দিয়ে ভাষাসৈনিকদের সে মর্যাদার শীর্ষ আসনে তুলতে পেরেছি? তাদের প্রতি সঠিক সম্মান জানাতে পেরেছি? শুধু দিবস পালন করে কিছু ফুলের তোড়া দিলেই সব কিছু হয়ে যায় না। ভাষাকে মনে-প্রাণে শ্রদ্ধা আর সম্মানের মাধ্যমে মূলত এই ভাষাসৈনিকদের শ্রদ্ধা করা হয়।
শুধু দিবস এলেই কেন আমাদের ভাষার প্রতি দরদ বা ভালোবাসা উথলে ওঠে! সারা বছর ধরে কেন আমরা ভাষার প্রতি এত সম্মান প্রদর্শন করতে পারি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ যত্রতত্র দেখা যায় ভাষার বিকৃতি। বানানের অবস্থা দেখলে আমাদের নিজেদের অসহায় মনে হয়! এই বানান ভুলের মহামারী সামাজিকমাধ্যম, দেয়াল লিখন, সাইনবোর্ডে সীমাবদ্ধ নেই! পাশাপাশি দেশের পাঠ্যপুস্তকেও দেখা যায় অজস্র ভুল। নিজের ভাষার সঙ্গে সঙ্গে অন্য ভাষার ওপর জ্ঞান অর্জন বা দক্ষতা থাকা ভালো। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা প্রায়ই দেখে থাকি অনেক তথাকথিত উপরের তলার লোক নিজেকে জাহির করার জন্য বিনা প্রয়োজনেও ইংরেজি আওড়ান। নিজেকে জ্ঞানীগুণী বা ভিন্ন স্ট্যাটাসের প্রকাশ করতেই এমন প্রয়াস। এহেন কার্যকলাপে আদতে কোনো বাহাদুরি নেই। নিজের ভাষার কাছে নিজেকেই ছোট করার শামিল। নিজের আঙিনায় নিজের ভাষাকে ভালোবেসে ব্যবহার করাই ভাষার প্রতি আন্তরিকতা।
অন্য ভাষার প্রতি বা অন্য সংস্কৃতির দিকে আমাদের মন এত উতলা হয় কেন বুঝি না! আমাদের কমতি কীসের? কবিও বলে গিয়েছিলেন, আমাদেরও আছে ধনে ধনে ভরা বিবিধ রতন’।
বিভিন্ন বিপণি বিতানে ইংরেজি নাম বা কিছু প্রদর্শন করলেই সেটা খুব আলাদা কিছু বহন করবে এমন ভাবা নিছকই বোকামি। আর এখন মনে হচ্ছে পাশের দেশের ভিন্ন ভাষার আগ্রাসী সিরিয়ালের মতো সে দেশের ভাষাও আমাদের দেশে ঢুকে যাবে! আমরা যখন নিজের ভাষাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসব তখন স্বাভাবিকভাবে নিজের সংস্কৃতির প্রতিও ভালোবাসা জেগে উঠবে।
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি প্রেম আয়নার মতো চকচক করে। তাদের সব কিছুতেই তাদের ভাষা চোখে পড়ে। গাড়ির নম্বর প্লেট থেকে শুরু করে বাড়ি বা দেয়াল লিখন এবং সাইনবোর্ড সবকিছুতে। এমনকি তাদের সংস্কৃতি আর বিনোদনের মাধ্যমগুলোতেও তাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা ফুটে ওঠে। চীনারা এদের মধ্যে অন্যতম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় তাদের তৈরি চলচ্চিত্রগুলোতে শুধু তাদের ভাষাই ফুটে উঠেছে। কিন্তু আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে অন্য ভাষায় (ইংরেজি) আভিজাত্য প্রকাশ করা হয়।
আমাদের দেশে যানবাহনের নম্বর প্লেটে বাংলা করার কার্যক্রম প্রশংসনীয়। তবে কেন বাস্তবায়ন করতে যেন আমাদের খুব কষ্ট হয়। শুধু পরিবহন খাত কেন? আমরা চোখে পড়ার মতো সবকিছুতেই বাংলা দেখতে চাই। অন্য ভাষায় কোনো ডিসপ্লে আমরা আর দেখতে চাই না। চারদিকে শুধু বাংলা আর বাংলা দেখতে চাই। এটা আনন্দের ব্যাপার যে অফিস আদালতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। সব স্থানেই বাংলার ব্যবহার চাই! মানুষের মুখে মুখে বাংলা ভাষার জয়গান নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের অন্তরেও নিজের ভাষার ঠাঁই দিতে হবে মর্যাদার উচ্চাসনে। সবাই এই ভাষার মাস থেকেই অঙ্গীকার করি মনে-প্রাণে বাংলা চাই।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © Rangpur24.com
Theme Customized By BreakingNews