পীরগঞ্জে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চতরা নীল দরিয়া নীলাম্বরের রাজার সৌন্দর্য্য বিলীনের পথে

নিউজ ডেক্স

রংপুর টুয়েন্টিফোর ডটকম , রংপুর

9 October, 2018 -> 9:25 am.

রংপুরের পীরগঞ্জে চতরা ইউনিয়নের নীল দরিয়া নীলাম্বর রাজার রাজধানী প্রশাসনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সৌন্দর্য্য বিলীনের পথে। জানা গেছে, ১২শ শতাব্দির মাঝা-মাঝি উত্তর জনপদে এক সময় প্রবল পরাক্রান্ত রাজাগণ ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। তাদের বংশের শেষ রাজা নীলাম্বর দেব। নীলাম্বদের অনেক রাজধানী ছিল। সেগুলোর মধ্যে উন্নতম পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে চতরা নীলদরিয়া পরিচিত একটি এলাকায়। বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের রক্ষণাবেক্ষণ তদারকী না থাকায় আবহাওয়া মান গতিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নীলদরিয়া। ১২’শ শতাব্দিতে বাংলায় যখন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতাব ছিল তখন পাক ভারতের রাজধানী ছিল গৌড়ে। লক্ষণ সেন ছিল গৌড়ের রাজা। তারই অধীনে ছিলেন পীরগঞ্জের কিংবন্তীর রাজা নীলাম্বর দেব। তিনি গৌড়ের রাজা লক্ষণসেনকে কর দিতেন। সে যুগে হিন্দু রাজা-বাদশারা প্রজাদের উপর নিয়মিত কর তুলতেন। কর দিতে না পারায় প্রজাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চলতো। দিনের পর দিন যখন হিন্দু রাজাদের অত্যাচার মাত্রা বেড়েই চলছে। তখনই ১৭ জন পীর আউলিয়া আর্বিভাব হয় পাক ভারতে। এই আউলিয়াগণ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে ইসলাম ধর্মের কথা প্রচার করে থাকেন। লোকজন তাদের সাথে সহজে মিশতে এবং কথা বলতে পারায় ইসলাম ধর্মের দিকে মানুষ ধাবিত হয়। এ খবর গৌড়ে রাজা জানতে পেরে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সে সময় যুদ্ধ হতো তীর ধনুক দিয়ে। সেই যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে গৌড়ে রাজা পরাজিত হন এবং গৌড় মুসলমানদের দখলে আসে। ১৭জন আউলিয়ার মাঝে শাহ ইসমাইল গাজী (রাঃ) অন্যতম বলে জানা যায়। তিনি বড়দরগায় আস্থানা স্থাপন করেন। সেখান থেকেই কর আদায়ের জন্য লোক পাঠান হিন্দু রাজা নীলাম্বর দেবের কাছে তার রাজধানী চতরায়। কিন্তু নীলাম্বর মুসলমানদের কর দিতে অস্বীকার করায়। শাহ্ ইসমাইল গাজী (রাঃ) নীলাম্বর রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। শত্রু পক্ষের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য রাজা নীলাম্বর রাজধানীর ৫৬ একর জমির চতুরপার্শ্বে ৮০ হাত প্রস্থ এবং ৮০ হাত গভীর একটি পুকুর খনন করেন। তারই পরিখার মাটি দিয়ে রাজধানীকে সুরক্ষিত করার জন্য চারপার্শ্বে উচু করে ১৪ হাত প্রস্থের ইটের প্রাচীর নির্মাণ করেন। প্রাচীরের দক্ষিণে রাখা একটি মাত্র সদর দরজা। এই দরজা বন্ধ করা হলে রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ করার কোন সুযোগ ছিল না। রাজধানীর সুরক্ষার কাজ শেষ করে নীলাম্বরের সৈন্যরা রাজধানী থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দুরে এসে অসংখ্য বেড় গড় তৈরী করেন। সেই গড়ে হাতি পর্যন্ত লুকিয়ে থাকতে পারতো। এখনও সেই স্বাক্ষী হিসেবে গড় গুলো বিদ্যমান। নীলাম্বর রাজার রাজধানী স্মৃতি রক্ষায় আজ পর্যন্ত প্রতœতত্ব বিভাগ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি একটি সাইনবোর্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়নি এখানে। জলধার বেষ্টিত মাঝের উচু স্থানে কয়েক’শ গাছের চারা রোপন করে বনবিভাগ তাদের দায়িত্ব সেরেছে। ১২৬০ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে রাজধানীর চারপাশে খননকৃত পরীক্ষার উত্তর পূর্ব কোন ভরাট হয়ে যায়। অবশিষ্ট এলাকা এখনও গভীর নীল জলাধার। যে কারণে এলাকাবাসী এটির নাম করণ করেছে নীল দরিয়া। সেই সময়ের সুরক্ষিত প্রাচীরের ভগ্নাংশ ইট গুলো বর্তমানে আশপাশের লোকজন রাতের আধারে খুলে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো এক সময় এ গুলোর কোন চিহ্নও থাকবে না। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে প্রতাবশালী সেই নীলাম্বর রাজার রাজধানীর শেষ চিহ্নটুকুও। খুবই শীঘ্রই প্রতœতত্ব বিভাগ রাজার স্মৃতি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এমটাই প্রত্যাশা সকলের।