ধর্মীয় অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও সম্প্রীতির অভাবই সহিংস উগ্রবাদের কারণ সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সজাগ মোকছেদুলেরা

8 October, 2018 -> 3:27 am.

সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করতে কখনো কখনো দুর্যোগের মত মাথা চাড়া দেয়ার চেষ্টা করে সহিংস উগ্রবাদ। যার পরিনাম কখনোই ভালো হয় না। ধর্মীয় অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও সাম্প্রদিক সম্প্রীতির অভাবেই জন্ম নেয় সহিংস দানবের। যা মানবাধিকারকে গলা চেপে হত্যা করে। মানুষের মনুষত্যকে বিষিয়ে তোলে ক্রোধের আগুনে। এতে করে লাশের পর লাশ আর কান্নায় দিহেশারা হয়ে উঠে একেকটি সংসার, সমাজ ও সম্প্রদায়। এমন সহিংস উগ্রবাদ কোন মানুষেরই কাম্য নয়। বরং সহিংস উগ্রবাদের ভয়াবহতা থেকে প্রতিটি সংসার, সমাজ, সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখতে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চ্যালেঞ্জিং কার্যক্রম। যার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে সচেতনতা, কমছে ধর্মীয় গোড়ামি এবং ছড়িয়ে পড়ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। সহিংস উগ্রবাদ রোধে জনমত সৃষ্টিতে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নেতাদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ পুলিশের রংপুর রেঞ্জ ও রংপুর জেলা এবং বিভাগীয় প্রশাসনের সূত্র মতে, গেল পাঁচ বছরে রংপুর বিভাগের কয়েকটি এলাকাতে স্পর্শকাতর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাতের অধারে চাঁদে মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মুখ দেখাকে কেন্দ্র করে রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকাতে ঘটেছিলো ব্যাপক সহিংসতা, গাইবান্ধাতে রংপুর চিনিকল এলাকার অদিবাসীদের উচ্ছেদকে ঘিরেও ঘটে সহিংসতা। এছাড়াও আন্দোলনের নামে মিঠাপুকুরে বাস যাত্রীদেরকে পেট্রল বোমার আগুনে পুড়িয়ে হত্যাকে সহিংসতার রুপে ছড়িয়ে দেয়া এবং ফেসবুকে ধর্মীয় উষ্কানিমূলক স্ট্যাটাস ও ছবি দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রংপুরের পাগলাপীরে হিন্দুপল্লীতে সহিংস উগ্রবাদের জন্ম নিয়েছিলো। তান্ডবের আগুনে জ্বলে ওঠা এসব সহিংস ঘটনায় যেমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তেমনি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন কয়েক’শ মানুষও। রংপুরের মিঠাপুকুর ও পাগলাপীর ঠাকুরপাড়া ছাড়াও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জসহ বৃহত্তর রংপুরে বিভিন্ন সময় সহিংস ঘটনার পর সহিংস উগ্রবাদের কুফল এবং ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত করতে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংস্থার করা সম্প্রীতি সমাবেশ ব্যাপক সাড়া ফেলে। ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমেও সম্প্রীতির আওয়াজ ছড়িয়ে দেয়া হয় সবখানে। মসজিদ, মাদরাসা, মন্দিরসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে খতিব, ঈমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত ও ধর্মগুরুরা সহিংসতা ও উগ্রবাদ বন্ধে বিশেষ আলোচনা করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, সুধী সমাজ, জনপ্রতিনিধিগণসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনজিও সহিংস উদ্রবাদ প্রতিরোধে কাজ করছেন। বর্তমানে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে কমে এসেছে সহিংস উগ্রবাদ। দিন দিন বাড়ছে সহিংস উগ্রবাদ বিরোধী মানুষের সংখ্যা। মুক্তি মিলছে ধর্মীয় অজ্ঞতা ও অসচেতনতার অভিশাপ থেকে। অসাম্প্রদায়িকতার মেলবদ্ধনে ফের শক্তিশালী হচ্ছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সম্প্রীতির আওয়াজ। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম খতিব মুয়াজ্জিন, মাদরাসার হুজুর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সরকারি- বেসরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ সচেতন মহল সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির পাশাপাশি এর ভয়াবহতার ব্যাপারে সতর্কতা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জে, হাট-বাজারে, শহর-বন্দরে সহিংসতার বিরুদ্ধে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সচেতনতার আওয়াজ। সেই আওয়াজে বদলে গেছেন মোকছেদুল মন্ডল (ছদ্মনাম)। পেশায় তিনি একজন দিনমজুর। মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে সাঈদীকে চাদে দেখার গুজবে সৃষ্ট ভয়াবহ সহিংসতায় হারিয়েছেন একমাত্র ছেলে সন্তানকে। হারানোর সেই ব্যথা তাকে যতটা না তাড়িত করে, এর চেয়েও বেশি কষ্ট পায় মাইকে ভেসে আসা মিথ্যে কথাগুলো যখন তার মনে পড়ে। এক সময় ধর্মীয় অজ্ঞতার অন্ধকারে থাকা মোকছেদুল মন্ডল এখন সহিংসতার বিরুদ্ধে। এখন তিনি সোচ্চার উগ্রবাদের ব্যাপারেও। মসজিদের খতিবের বয়ান আর উপজেলা স্কুল মাঠের সম্প্রীতি সমাবেশে সব ধর্মের মানুষের বক্তব্যে তার চোখ খুলে গেছে। বদলে গেছে তার মনের ভ্রান্ত দিকগুলো। মোকছেদুল মন্ডলের ভাষায়- ‘আসলে মুই সেই দিন বোজো নাই গুজব কি জিনিস। চানের ভিতরোত মাইসের মুক দেকা যায় না। এটা যদি ভাবনু হয়, তাইলে জেবনে এত বড় ভুল হইল ন্যা হয়। মুক্তবের মাইকোত ঘোষণা শুনি সেদিন আইতোতে বাড়ি থাকি মুই মিছিলোত গেচনু। সাথে মোর ব্যাটাও গেচিল। আস্তা অবরোধ করি লাঠি সোডা নিয়্যা হাঙ্গামা হইচে। গোলাগুলি হইচে। আইজ মুই বাচি আচু, খালি নাই মোর ব্যাটা কোনা। সেই দিন চানদোত সাইদি সাইবের মুক দেকা নিয়্যা যা হইচে, সেটা মাইসোক বোকা বানে করা হইচে। এমন সহিংসতা মুই কোনো দিনও দেকো নাই’। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়া মোকছেদুল মন্ডল জানান, সে কোন দিনও মিছিলে যাননি। কখনো কোন দলের হয়ে কাজও করেননি। অন্যের জমিতে দিনমজুরিতে কাজ করতেই হিমশিম। হাদিস কোরআন সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞান না থাকলেও রয়েছে আল্লাহ্ ভীতি। চেষ্টা করেন প্রতিদিন জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে। ‘মাওলানা সাঈদীকে চাঁদে দেখা গিয়েছি, সে নিরাপরাধী, আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন, আসুন আমরা তার ফাঁসি ঠেকাতে বাইরে বেরিয়ে পড়ি’ এরকম মাইকিং শুনেই তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে ছেলেকে সঙ্গে করে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। সেদিন হাজার হাজার মানুষকে লাঠি সোডা হাতে জড়ো হতে দেখেছেন। তারপর যা ঘটেছে, তা তো সবার জানা। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন দেশের সচেতন মহলসহ প্রশাসনের দাবি, সহিংস এসব ঘটনার নেপথ্যে ধর্মীয় অজ্ঞতা, অসচেতনতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্প্রীতির অভাব কাজ করেছে। দেশকে অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিতে অনেকেই চেষ্টা করেন সহিংস উগ্রবাদের জন্ম দেয়ার। যার ফলে কখনো কখনো সহিংস উগ্রবাদের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের পর গ্রামে, শহর থেকে আরেক শহরে। দেশে মানবতাবিরোধীদের বিচারের রায়কে ঘিরেই যে শুধু এরকম ঘটনা ঘটে তা নয়। নির্বাচন এলেও এরকম ঘটনা ঘটে। অসচেতন মানুষের ধর্মীয় অজ্ঞতাকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মিথ্যে গুজব ছড়িয়ে সহিংস উদ্রবাদ সৃষ্টির আড়ালে ফায়দা লুটেরা স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন বহুবার। এসব ঘটনার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অসচেতনতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় শিক্ষার অভাবের কারণেই স্বার্থানেষী মহলের উষ্কানিতে এমন সহিংস উগ্রবাদের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও ধর্মীয় অজ্ঞতাকে উগ্রবাদের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যার কিছুটা আলামত বোঝা গিয়েছিলো মোকছেদুল মন্ডলের কথাবার্তায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে এবং শান্তি ও সহনশীলতা ধরে রাখতে রংপুর বিভাগের আট জেলায় গেল কয়েক বছরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, কমিউনিটি পুলিশসহ বিভিন্ন এনজিও’র আয়োজনে অন্তত সহ¯্রাধিকের বেশি মানববন্ধন, সম্প্রীতি সমাবেশ, সুধি সমাবেশ ও রাজনৈতিক সমাবেশ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাপক প্রচারাভিযান চালানো হয়েছে। এছাড়াও গ্রামে গঞ্জে, হাট বাজারে ভিডিও প্রজেক্টরের বড় পর্দায় তথ্য চিত্রের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম দেখানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা ও সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে তথ্য মন্ত্রণালয়সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন মোকছেদুল মন্ডলের মত সাধারণ মানুষের বেশির ভাগই বিশ্বাস করেন ‘ধর্ম দাঙ্গা-হাঙ্গামার পক্ষে নয়। ধর্মে জ্বালাও-পোড়াও নেই। ধর্ম কারো ক্ষতি করতে উষ্কানি দেয় না। কারো সাথে ধর্মীয় বিরোধ থাকতে পারে না। ধর্ম যার যার মানুষ সবাই সবার’। এই বিশ্বাস ও সম্প্রীতি যেন নষ্ট না হয় সেজন্য সকলকে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে বলেও মনে করেন সচেতন সমাজের প্রতিনিধিরা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, সহিংসতা, উগ্রবাদ কারোই কাম্য নয়। যারা এসবের জন্ম দেয় তাদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। কারো উষ্কানি বা গুজবে কান দেয়া যাবে না। হিংসা বিদ্বেষ থেকে বেড়িয়ে এসে পাড়া-মহল্লায়, গ্রামে গঞ্জে, শহরে বন্দরে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি গড়ে তুলতে হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন রংপুর বিভাগীয় মোঃ আবুল কালাম বলেন, মানবতাবিরোধি অপরাধে অভিযুক্ত মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে ঘিরে মিঠাপুকুর উপজেলায় সংঘটিত যে তান্ডব দেশবাসী দেখেছে, তা ছিলো সহিংস উদ্রবাদ। সেইদিন সামান্য একটি মিথ্যে গুজবে সাড়া দিয়ে সহিংস তান্ডব চালাতে গিয়ে গোলাগুলিতে অনেক পিতাই সন্তান হারিয়েছেন। কেউ কেউ হারিয়েছেন তার স্বামী, পিতা ও ভাইকে। গ্রামের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে যারা এই ঘটনার জন্ম দিয়েছিলো তাদের বিরুদ্ধে এখন মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। ##