ব্রেকিং নিউজ-

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসেও গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসীরা শহীদ মিনারে সমাবেশ করতে পারেনি

আলমগীর মন্ডল

গোবিন্দগঞ্জ প্রতিনিধি , গাইবান্ধা

9 August, 2018 -> 7:44 am.

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসীদের স্থানীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রশাসন অনুমতি দেয়নি। আদিবাসী পল্লী মাদারপুর থেকে ব্যানার, ফেস্টুন ও লাল পতাকায় সজ্জিত বিক্ষোভ মিছিল মাদারপুর-জয়পুর থেকে শুরু করে কাটার মোড় হয়ে দীর্ঘ ৮ কিঃ মিঃ রাস্তা অতিক্রম করে গোবিন্দগঞ্জ শহীদ মিনার সমাবেশস্থলে পৌঁছার আগে গোবিন্দগঞ্জ গার্লস স্কুল মোড়ের মাথায় পুলিশ মিছিলের গতি রোধ করে। এ সময় সেখানে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপস্থিত ছিলেন। পরে মিছিলকারীরা গার্লস স্কুল মোড়েই বসে পরে এবং সেখানেই সমাবেশ করে। সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও জনউদ্যোগ যৌথভাবে এ কর্মসুচীর আয়োজন করে। সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবি জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি ওয়াজিউর রহমান রাফেল, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদের আহবায়ক এ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদের সদস্য সচিব প্রবীর চক্রবর্তী, সিপিবি জেলা কমিটির সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য প্রতিভা সরকার ববি, সিপিবি উপজেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফুরুল ইসলাম প্রধান, মানবাধিকার কাজী আব্দুল খালেক, অঞ্জলি রানী, আদিবাসী নেতা গণেশ মুর্মু, সুফল হ্রেমব্রম, থমাস হেমব্রম, বার্নাবাস টুডু, রেজাউল করিম, স্বপন শেখ, প্রিসিলা মুর্মু, অলিভিয়া মার্ডি প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, সাধারণত কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অণুপ্রবেশকারী বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে যারা বসবাস করত এবং এখনও করে; যাদের নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা সমাজে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত, তারাই আদিবাসী। আদিবাসীদের উপজাতি হিসেবে সম্বোধন করা একেবারেই অনুচিত, কারণ তারা কোন জাতির অংশ নয় যে তাদের উপজাতি বলা যাবে। বরং তারা নিজেরাই এক একটি আলাদা জাতি। এ সময় বক্তারা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ায় যুগে যুগে এদের অনেকে প্রান্তিকায়িত, শোষিত। যখন এসব অন্যায্য, অবিচারের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকারের স্বপক্ষে তারা কথা বলেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা দমন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসীরাও তার ব্যতিক্রম নয়। এ প্রসংগে বক্তারা বলেন, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর রংপুর সুগার মিল কর্তৃপক্ষ বেআইনীভাবে (কোর্টের আদেশ ব্যতীত) আদিবাসীদের নির্মিত বসতবাড়ি, ফসলাদি ও মৎস্যখামারে পুলিশ, প্রশাসনসহ স্থানীয় প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের দ্বারা উচ্ছেদের নামে নিরীহ আদিবাসীদের উপর হামলা বসতবাড়ি ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং বর্বরোচিতভাবে গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে ও নির্যাতনে শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মারডি ও রমেশ টুডু নিহত এবং অনেকেই গুরুতর আহত হয়। গুরুতর আহতদের মধ্যে অনেককে গ্রেফতার করে। এমনকি পুলিশ আদিবাসী-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে অনেককে গ্রেফতার ও নির্যাতন করে জেল হাজতে প্রেরণ করে। আদিবাসী সাঁওতালদের স্কুল তছনছ করে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বক্তারা আরও বলেন, প্রায় ২ বছর হলো বাগদাফার্মের আদিবাসীরা বাড়ি-ঘর হারিয়ে মানববেতর জীবন যাপন করছে। স্কুল ঘর পুড়িয়ে দেয়ার কারণে তাদের সন্তানেরা ২ বছর হলো পড়াশুনা করতে পারছে না। স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয় অবহিত করা হলেও কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের নিরীহ আদিবাসী-বাঙালিদের উপর সংঘটিত হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত এবং আখ চাষের নামে রিক্যুজিশনকৃত ১৮৪২.৩০ একর বাপ-দাদার জমিতে আদিবাসী ও প্রান্তিক বাঙালি কৃষকদের আইনগতভাবে জমি ফেরত দেয়ার দাবিসহ সাত দফা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবী জানান। সমাবেশে স্থলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাফিউল আলম বলেন, আদিবাসীদের দাবিগুলো পুরনের বিষয়টি সম্পূর্নই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারনী বিষয় তাই এখানে তাদের কিছুই করার নেই। তারা আদিবাসীদের দাবিগুলো উচ্চ পর্যায়ে জানাবেন। পরে সমাবেশ স্থল থেকে নিম্মোক্ত ৭দফা দাবি তুলে ধরে তা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। আদিবাসীদের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার; ক্ষতিগ্রস্থ আদিবাসী-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা এবং আদিবাসী-বাঙালি নারী-পুরুষের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জুলুম ও পুলিশী হয়রানি বন্ধ করা; আদিবাসীদের সম্পত্তি কোন সরকার/কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রিক্যুইজিশন (জবয়ঁরংরঃরড়হ) করা এখতিয়ার কহির্ভূত হওয়ায় এ ধরণের কার্য বাতিল ও সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করা; ১৯৪৮ সালের ঞযব ঊধংঃ ইবহমধষ (ঊসবৎমবহপু) জবয়ঁরংরঃরড়হ ড়ভ চৎড়ঢ়বৎঃু অপঃ মোতাবেক যে কার্যের জন্য (ইক্ষুচাষ) গ্রহণ হয় তা না করা হলে খেসারতসহ পূর্বমালিক আদিবাসীদের ফেরতের বিধান বাস্তবায়ন করা; আদিবাসী সাঁওতালদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগকারী চিহ্নিত পুলিশ কর্মকর্তাসহ জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা; ২০০৪ সালে সুগার মিল বন্ধের পর প্রভাবশালীদের মাঝে লিজের নামে যে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি হয়েছে সেই দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।