বড়পুকুরিয়ার কয়লার পর এবার মধ্যপাড়া পাথর খনিতেও তিন লাখ ৬০ হাজার মেক্ট্রিকটন পাথর উধাও

হারুন-উর-রশিদ

ফুলবাড়ী প্রতিনিধি , দিনাজপুর

6 August, 2018 -> 8:22 am.

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির, কয়লা ঘাটতির তদন্ত শেষ না হতেই। এবার দেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়াতেও পাথর উধাও এর অভিযোগ উঠেছে। উত্তোলন কৃত পাথরের মধ্যে তিন লাখ ৬০ হাজার পাথর ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার বাজার মুল্য ৫৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। যদিও খনি কর্তৃপক্ষ বলছে পাথর উধাও হয়নি পদ্ধতিগত লোকশান। খনি সুত্রে জানাগেছে, এই পর্যন্ত মধ্যপাড়া পাথর খনিটিতে ১২ বছরে ৪৭২ কোটি টাকা লোকশান হয়েছে, ঘাটতি পাথরের মুল্য যোগ করা হলে এই লোকশানের পরিমান আরো বৃদ্ধি পাবে। এই ঘটনায় পরষ্পর বিরোধি বক্তব্য পাওয়া গেছে খনি কর্মকর্তাদের, খনির নিজেস্ব্য কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি পদ্ধতিগত ঘাটতি (সিস্টেম লস) বললেও অপর পক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। তবে খনি কতৃপক্ষ বলছে পাথরের ঘাটতি নাই, পাথর ইয়াডে অবিক্রয় যোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে পাথর ইয়াডে। খনি সুত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সাল থেকে খনিটিতে বানিজ্যিক ভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। চলতি সনের ৩১ জুলাই পর্যন্ত খনি থেকে পাথর উত্তোলন হয়েছে ৪১ লাখ ৭৫ হাজার ৭১০ মেক্ট্রিকটন। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারী থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত বর্তমান ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি পাথর উত্তোলন করেছে ২১ লাখ ৬১ হাজার মেক্ট্রিকটন। গত ১২ বছরে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ মেক্ট্রিক টন পাথর ঘাটতি। তবে বর্তমান হিসেবের সাথে অনেক পার্থক্য দেখা দিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। মধ্যপাড়া পাথর খনিতে প্রথম পাথর ঘাটতি দেখা দেয় ২০১২ সালে এই নিয়ে খনিটির মার্কেটিং বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগ একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে, সেই সময় ২ লাখ ২৭ হাজার মেক্ট্রিক টন পাথর ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘটনায় সেই সময় কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, সেই তদন্তর প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি। সেই ঘাটতির ঘটনা এক সময় ধামাচাপা পড়ে যায়। সম্প্রতিক বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কয়লা উধাও এর ঘটনা চা লকর পরিস্তিথি সৃষ্টি হলে নতুন করে পাথর ঘাটতির ঘটনাটি নজরে আসে। সুত্রটি আরো জানায় গত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে পাথরের ঘাটি হিসেব খনিটির পরিচালানা পর্ষদ এর নিকট উত্থাপন করে খনি কতৃপক্ষ। এ সময় পরিচালনা পর্ষদ খনিটির মহা-ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) আবু তালেব ফরাজিকে প্রধান করে ৫ সদস্যর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব ফরাজির তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছর থেকে ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে পর্যন্ত উত্তোলন কৃত পাথরের হিসেবে ১৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ পাথররের পরিমাপ ভুল ও ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ পাথর পদ্ধকিগত ঘাটতি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন হয়েছে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬৯ মেক্ট্রিকটন। ভুল পরিমাপ ও সিস্টেম লস বাদ দিলে উত্তোলন কৃত পাথরের হিসেব দাড়ায় ১৩ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ মেক্ট্রিকটন। এখানে ঘাটতি দেখা যায় দুই লাখ ২৭ হাজার ২৩৩ মেক্ট্রিক টন। অপরদিকে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ জুন পর্যন্ত উত্তোলন কৃত পাথরের দউি দশমিক ৩৫ শতাংশ সিস্টেম লস দেখানো হয়েছে, এতে ঘাটতি রয়েছে ২৬ হাজার ৮৭ মেক্ট্রিক টন। মোট ঘাটতি তিন লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ মেক্ট্রিক টন। গতকাল সোমবার মধ্যপাড়া পাথর খনিতে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১১টি পাথর ইয়াডের মধ্যে মাত্র ৫টি ইয়াডে পাথর আছে, বাকি ৬টি ইয়াডে কোন পাথর নাই। খনিটির মহা-ব্যবস্থাপক (অপরেশন) আসাদুজ্জামান পাথর ইয়াড গুলো ঘুরে দেখিয়ে বলে, এই পাথর ইয়াড গুলো ৪ থেকে ৫ ফিট গভির ছিল, যা পাথর দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, যার একটি দৈঘ্য ও প্রস্ত প্রায় ৫০০ ফিট করে। তিনি বলেন যে পরিমান পাথর হিসেবে ঘাটতি রয়েছে তা হিসেবে থাকলেও এই ইয়াডের মধ্যে অবিক্রয়যোগ্য হয়ে পড়ে আছে বলে তিনি দাবী করেন। জানা গেছে মধ্যপাড়া পাথর খনিতে ২০০৬ সাল থেকে কোরিয়ান নামনাম কোম্পানীর হাতধরে পাথর উত্তোলন শুরু হয়, কিন্তু আশানুরুপ পাথর উত্তোলন না হওয়ায়, খনিটি লোকশানের দিকে যায়। এই কারনে খনিটিকে লোকশানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পাথর উত্তোলন বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাথর উত্তোলন বৃদ্ধির জন্য ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জার্মানিয়া ট্রাষ্ট কনসোডিয়াম (জিটিসি) এর সাথে প্রতিদিন ৫ হাজার টন করে পাথর উত্তোলনের লক্ষমাত্রা নিয়ে ৬ বছরে ৯২ লাখ মেক্ট্রিকটন পাথর উত্থোলনের চুক্তি করে। জিটিসি ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে সফলতার সহিত পাথর উত্তোলন করছে। বর্তমানে খনিটিতে প্রতিদিন সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৪৮০০ মেক্ট্রিকটন পাথর উত্তোলন হচ্ছে। এরই মধ্যে তিন লাখ ৬০ হাজার মেক্ট্রিকটন পাথর উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটলো।