ব্রেকিং নিউজ-
নতজানু নীতি পরিহার করে তিস্তা-সহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করুন--------কমরেড খালেকুজ্জামান** রংপুরে দুদিন ব্যাপী ফ্রি ডেন্টাল ক্যাম্প উদ্ভোধন ** রংপুরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর ৯০ তম জন্মদিন পালন ** রংপুরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানব্বন্ধন সমাবেশ ** উলিপুরে ‘দৈনিক ভোরের ডাক’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকা পালিত** রংপুরে সিলেকশন গ্রেড এর দাবিতে মানব বন্ধন ও পরিচালকের কার্যালয় ঘেরাও ** কাদেরের বাইপাস সার্জারি চলছে, দেশবাসীর দোয়া কামনা** রংপুর জেলা রেস্তোরাঁ শ্রমিক ইউনিয়নের বিশেষ সাধারন সভা অনুষ্ঠিত** লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় অগ্নিকান্ডে প্রায় ৯ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি** রংপুরে আ.লীগের প্রার্থীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ **

মৃতপ্রায় রংপুর অঞ্চলের ১৫০টি নদী

নিউজ ডেক্স

রংপুর টুয়েন্টিফোর ডটকম , রংপুর

14 March, 2019 -> 4:12 am.

আজ ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস। সর্বত্র দিবসটি পালন হলেও নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো কালের বিবর্তনে আজ মরা খালে পরিণত হচ্ছে। পানির অভাবে নাব্যতা হারিয়ে রংপুর অঞ্চলেরই প্রায় ১৫০টি নদী এখন মৃতপ্রায়। সীমান্তবর্তী দেশ ভারত উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অর্ধশতাব্দী আগেও এসব নদীতে ছিল উত্তাল পানির প্রবাহ ও প্রাণের স্পন্দন। এখন সেই যৌবনে ভাটা পড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে নদীর অস্তিত্ব। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ড. তুহিন ওয়াদুদের 'রংপুর অঞ্চলের নদ-নদী' বইসূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলায় নদ-নদীর সংখ্যা দুই শতাধিক। যার ১৫০টি নদীই আজ মৃতপ্রায়। বাকি যে কয়েকটি নদী আছে তার গতি ঠিক রাখতেও নেই কোনো পরিচর্যা। উত্তরের প্রাচীনতম জনপদ রংপুর অঞ্চলের গাইবান্ধায় রয়েছে আলাই, ইছামতি, করতোয়া, কাটাখালি, কালপানি, গাংনাই/খিয়ারী, ঘাঘট, তিস্তা, নলেয়া, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, মত্স, মরা, মরুয়াদহ, মাইলা মানাস, মাশানকুড়া, বাঙালি, লেঙগা, শাখা তিস্তা, হলহলি। কুড়িগ্রামে অন্তাই, কালজানি, কালো, কুরসা, কোটেশ্বর, খলিশাকুড়ি/অর্জুনেরডারা, গঙ্গাধর, গদাধর, গিরাই, গোদ্ধার/বোয়ালমারী, ঘড়িয়ালডাঙা, ঘাগুয়া, চন্ডিমারী, চাকিরপশা, চান্দাখোল, জালশিরা, জিঞ্জিরাম, তিস্তা, তোর্সা, দুধকুমার, দেউল, ধরণী, ধরলা, নওজল, নাগদহ, নীলকুমার, নাগেশ্বরী, পয়রাডাঙা, পাঁচগাছিরছরা, ফুলকুমার, ফুলসাগর, বামনী, বারোমাসি, বুড়িতিস্তা, বুড়া ধরলা, বোয়ালমারী, ব্রহ্মপুত্র, মহিশকুড়ি, রতনাই, শিয়ালদহ, সঙ্কোশ, সোনাভরি, হলহলিয়া, হাওরার বিল, হাড়িয়ার ডারা। নীলফামারীতে আউলিয়াখান, করতোয়া, কলমদার, কুমলাল, খড়খড়িয়া, খলিসাডিঙি, চারা, চারালকাঠা, চিকলি, চেকাডারা, তিস্তা, দেওনাই, ধাইজান, ধুম, নাউতারা, নেংটিছেঁড়া, বামনডাঙা, বুড়িখোড়া, বুড়িতিস্তা, বুল্লাই, যমুনেশ্বরী, শালকি, স্বরমঙলা। লালমনিরহাটে গিদারী, চতরা, ছড়াবিল, তিস্তা, ত্রিমোহনী, ধরলা, ভেটেশ্বর, মরাসতী, মালদাহা, রতনাই, সতী, সাকোয়া, সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী, স্বর্ণামতী। রংপুরে আখিরা, আলাইকুড়ি, ইছামতি, করতোয়া, কাঠগড়ি, খাঁড়ুভাঁজ, খোকসাঘাঘট, ঘাঘট, ঘিরনই, টেপরীর বিল, তিস্তা, ধুম, নলশীসা, বুড়াইল, ভেলুয়া, মরা, মানাস, যমুনেশ্বরী, সোনামতি, শাখা চিকলি, শ্যামাসুন্দরী চিকলি, বুল্লাই, নলেয়া, খটখটিয়া, বাইশা ডারা, বুড়াইল, নেংটি ছেড়া, মাশানকুড়া। দিনাজপুরে আত্রাই, ইছামতি, করতোয়া, কালা, কাঁকড়া, কাঞ্চন, গর্ভেশ্বরী, ঘাকশিয়া, ঘিরনই, চিরনাই, চিরি, ছোটযমুনা, ঢেপা, তিলাই, তুলসিডাঙা, তেতুলিয়া, নর্ত, নলশীসা, নাল, পাথারঘাটা, পুনর্ভবা, বিজরা, বেলান, ভাবকি, ভেলামতি, মহিলা, মাইলা, রণগাঁও, শাশুয়া। ঠাকুরগাঁওয়ে অহনা/নহনা, কুলিক, খোড়া, চারাবান, ছোট ঢেপা, ছোট সেনুয়া, টাঙন, তীরনই, নাগর, পাথরাজ, ভক্তি, ভুল্লি, লাচ্ছি, লোনা, শুক, সেনুয়া, ধরধরা এবং পঞ্চগড়ে আলাইকুমারী, করতোয়া, কাঠগিরি, কালিদহ, কুরুণ, কুরুম, খড়খড়িয়া, গোবরা, ঘোড়ামারা, চাওয়াই, চিলকা, ছাতনাই, ঝিনাইকুড়ি, টাঙন, ডাহুক, ডারা, ডারি, তালমা, তীরনই, তিস্তাভাঙা, নাগর, পাইকানি, পাঙা, মরাতিস্তা, পাম, বহু, বাগমারা, বহিতা, বুড়িতিস্তা, বেরং, বোরকা, ভেরসা, মহানন্দা, যমুনা, রণচন্ডী, রসেয়া, রাঙাপানি, শালমারা, সাও, সিংগিয়া, সুই, হাতুড়ি ও হুয়াড়ি। এসব নদীর অধিকাংশেরই এখন নাব্যতা নেই। বর্তমান সময়ে কোনো কোনো নদীতে হাঁটুজলও শুকিয়ে গেছে। একসময় এসব নদীর বুকে পাল তোলা নৌকায় পারাপার হলেও এখন পায়ে হেঁটে চলছে মানুষ। তিস্তায় এখন হাঁটুপানি। পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়। সর্বকালের সর্বনিম্ন পানিপ্রবাহ এখন তিস্তায়। নদীর প্রস্থ এখন ২০ থেকে ২৫ ফুট। নোপথ প্রায় বন্ধের পথে। পানিল অভাবে ঘাট আজ এখানে তো কাল ওখানে সরিয়ে নিতে হচ্ছে। উজানে ভারত ব্যারাজ নির্মাণ করে তিস্তার প্রাকৃতিক প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করছে। একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ১১২ মাইল দীর্ঘ এই নদী শুকিয়ে এখন মৃতপ্রায়। তিস্তার চরে কাজ শেষে পায়ে হেঁটে নদী পার হয়ে আসেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মিটারী এলাকার দুলাল মিয়া ও শমসের আলী। এ সময় তারা জানান, তিস্তায় এখন হাঁটুপানি। ক্ষীণ হয়ে এসেছে নদী। হ্রাস পেয়েছে নাব্যতা। শুষ্ক মৌসুমে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর-ডুবোচর। তিস্তার বুকজুড়ে এখন বালু আর বালু। দিগন্তজুড়ে সবুজের মাঠে কৃষকরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চরে আলু, তামাকসহ বিভিন্ন ফসল চাষে। সামান্য বর্ষার ছোবলে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করা করতোয়া নদীও এখন পানিশূন্যতায় ধুকে মরছে। কোথাও নেই আগের সেই প্রবাহ। নেই ডিঙি নৌকা। ক্ষীণ এ নদীর প্রবাহ গাইবান্ধা ও বগুড়ায় প্রবেশ করে কিছুটা গতি পাওয়ার চেষ্টা করলেও তা এখন শুধুই ইতিহাস। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ওপর দিয়ে একসময় প্রবাহিত আলাইকুড়ি নদী এখন পরিণত হয়েছে মরা খালে। কালের আবর্তনে মরে যাচ্ছে গঙ্গাচড়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘাঘট নদী। পানিশূন্য হয়ে পড়ায় নদীটির বুকে আবাদ হচ্ছে বিভিন্ন ফসল। আর কয়েকটি বছর পরে স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে যাবে এই নদী। যার বুকজুড়ে লোকজন জবরদখল করে আবাদ করছে। নদীটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বেকার হয়ে পড়েছে শত শত মৎস্যজীবী। অভিজ্ঞ লোকজনের ধারণা নদীটি খনন করা হলে মৎস্য চাষসহ আবাদি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা যাবে। এতে কৃষকরা উপকৃত হবে। জানা যায়, নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার কুজিপাড়া গ্রামে তিস্তার শাখা নদী হিসেবে ঘাঘট নদীর উৎপত্তি। ঘাঘট নদী গঙ্গাচড়া উপজেলার পশ্চিম সীমানা দিয়ে নোহালী, আলমবিদিতর ও বেতগাড়ি ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে রংপুর সদর হয়ে পীরগাছা উপজেলায় প্রবেশ করেছে। এরপর আলাইকুড়ি নদীর সঙ্গে গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। নদীটির আঁকাবাঁকা পথে ১২০ কিলোমিটার শুকিয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, একসময় এ নদীটির ওপর দিয়ে পাল তোলা নৌকা চলত। দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসত ব্যবসা করার জন্য। নদীপথে বিভিন্ন প্রকার পণ্য সরবরাহ করত লোকজন। সেই নদীর শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ এখন শূন্যের কোঠায়। অথচ বর্ষাকালে নদীর ভাঙনে প্রতিবছর বিলীন হয়ে যায় কূলবর্তী মানুষের ঘরবাড়ি। ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, নদীর সিকস্তি ও পয়স্তি আইন অনুসারে ঘাঘট নদীর বুকে জেগে উঠা জমিগুলো খাস জমির অন্তর্ভুক্ত। যা স্থানীয় লোকজন জবরদখল করে আবাদ করছে। একই অবস্থা মানাস নদীরও। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ভারত একতরফাভাবে পানিপ্রবাহ প্রত্যাহার করে নেওয়ায় একসময়ের জনগুরুত্বপুর্ণ নদী দুটির গুরুত্ব এখন নেই। একই কারণে রংপুর অঞ্চলের এমন প্রায় ১৫০টি নদীতে পানির অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ ব্যাপারে রিভারাইন পিপল এর পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এসব নদী পুনরুদ্ধার করতে হলে অবৈধ বাঁধ অপসারণ, নদীর তলদেশ খনন, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উৎসমুখ উন্মোচন করে কৃত্রিম ক্যানেলের মাধ্যমে ছোট নদীগুলোর সঙ্গে বড় নদীর সংযোগ সাধন করা গেলে কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের নদীগুলো আবার যৌবনে ফিরবে। ফের দেখা মিলবে খরস্রোতায় নদীপারের মানুষের ভাঙাগড়ার খেলা। তিনি আরো বলেন, ভারত থেকে পানি প্রদানের আশ্বাসে বসে থাকলে কোনো লাভ হবে না। এমন প্রতিশ্রুতি আমরা একাধিকবার কান পেতে শুনেছি, কিন্তু কিছুই পাইনি। এ জন্য আমাদের সরকারকেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কথা ভেবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।